অসুস্থতার চার দিনে মানুষের ভালোবাসা—আজীবন মনে রাখব

গত চার দিন ধরে আমি অসুস্থ। সর্দি, জ্বর, প্রচণ্ড মাথাব্যথা, কাশি, সারা শরীরে ব্যথা, হাত-পায়ে চাবানি ও বমি বমি ভাব—সব মিলিয়ে শারীরিকভাবে ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম। প্রথম তিন দিন বাড়িতেই ওষুধ সেবন করছিলাম। কিন্তু তেমন কোনো উন্নতি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।
মঙ্গলবার, ১৬ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে বড়লেখা সিটি ক্লিনিকের কর্তব্যরত চিকিৎসক জনাব আবু বক্কর সিদ্দিক সাহেবের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করি। আমার শারীরিক অবস্থার কথা বিস্তারিত শুনে তিনি দ্রুত ক্লিনিকে আসতে বলেন। বড় ভাইকে সঙ্গে নিয়ে রাত সাড়ে ১২টার দিকে গাড়িতে উঠে রওয়ানা দেই ক্লিনিকের পথে গাড়িতে বসে ক্লিনিকের ম্যানাজার আমার আদরের ছোট বোন আমার জানা মতে ক্লিনিকের সবচেয়ে পরিশ্রমি ব্যাক্তি প্রিয় বোন রোকশানা বেগম কে ফোন দেই সে ফোন ধরে বরাবরের মতো সালাম দিয়ে বললো ভাই কি হয়েছে আমি সালামের উত্তর দিয়ে বললাম ভাই ক্লিনিকে আসিতেছি একটি রুম রেডি করো,সে বললো ভাই কোন অসুবিধা নাই,গাড়িযোগে ক্লিনিকে পৌঁছাই।
ক্লিনিকের সামনে পৌঁছেই দেখা হয় সুজানগর ইউনিয়নের সাবেক বারবার নির্বাচিত চেয়ারম্যান সিটি ক্লিনিক এর সম্মানিত পরিচালক জনাব নছিব আলী সাহেবের সঙ্গে। আমাকে অসুস্থ অবস্থায় দেখে তিনি দুই হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে বললেন—
“আমার ভাইয়ের কী হয়েছে? হেই, কে কোথায় আছো? আমার ভাইকে নিয়ে উপরে যাও, আমি আসছি।”
সেই মুহূর্তে আমার এমন অবস্থা ছিল যে, ঠিকমতো কথাও বলতে পারছিলাম না।
ক্লিনিকের সবাই মিলে আমাকে ধরে উপরে নিয়ে একটি রুম পরিষ্কার করে শুইয়ে দেন। সঙ্গে ছিলেন আমার বড় ভাই ও স্ত্রী। কিছুক্ষণের মধ্যেই চিকিৎসক আবু বক্কর সিদ্দিক সাহেব এসে হাসিমুখে বললেন, “হানিফ ভাই, আপনার আবার কী হলো?”
আমি কোনো রকমে আমার অসুস্থতার কথা বললাম। তাঁর বিনয়ী, আন্তরিক ও আপনজনের মতো আচরণ আমাকে অনেক সাহস জুগিয়েছিল। তিনি বললেন—
“হানিফ ভাই, টেনশনের কিছু নেই। ভেঙে পড়া যাবে না, সব ঠিক হয়ে যাবে। আপনাকে সুস্থ করে আগামীকাল একসঙ্গে ঝালমুড়ি খাবো।”
একজন চিকিৎসকের মুখ থেকে এমন সহজ, আন্তরিক একটি কথা অসুস্থ একজন মানুষের মনে কতটা সাহস জোগাতে পারে—সেদিন নিজের অনুভূতি দিয়ে তা উপলব্ধি করেছি।
তিনি আমাকে চিকিৎসা দিয়ে কর্তব্যরত নার্সদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে বললেন, “কোনো ধরনের অবহেলা করা যাবে না।”
আমার অসুস্থতার খবর শুনে বড়লেখা প্রেসক্লাবের সম্মানিত সভাপতি ও পৌর মেয়র পদপ্রার্থী জনাব আনোয়ারুল ইসলাম সাহেব ফোন করে জানতে চাইলেন, “হানিফ, তোমার কী হয়েছে?” অসুস্থতার কথা বললে তিনি সাহস দিয়ে বললেন, “টেনশন করো না, সুস্থ হয়ে যাবে। আমি কাল তোমাকে দেখতে আসব।”
এরপর একের পর এক ফোন আসতে শুরু করল। কতজন যে ফোন করেছেন, তার কোনো হিসাব আমার কাছে নেই। শারীরিক অসুস্থতার কারণে দু-একটি ফোন ছাড়া অধিকাংশ ফোনই ধরতে পারিনি।
যাঁরা ফোন করেছেন, কিন্তু আমি ধরতে পারিনি—সবার কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী।
রাতে আমাকে দেখতে ক্লিনিকে ছুটে আসেন সিটি ক্লিনিকের পরিচালক জনাব সায়ফুর রহমান ভাই। আপনজনদের ভালোবাসা, চিকিৎসকদের আন্তরিকতা এবং সবার দোয়া-সহমর্মিতায় অসুস্থ শরীরের মাঝেও মনটা যেন কিছুটা শান্ত হয়ে আসে।
পরদিন, ১৭ সেপ্টেম্বর সকালে ঘুম থেকে উঠে স্ত্রী যখন রুমে এসে শরীরে হাত বুলিয়ে দিলেন, তখন মনে হলো আগের তুলনায় শরীরটা একটু আরাম পাচ্ছে। চা পান করার পর চিকিৎসক আবু বক্কর সিদ্দিক সাহেব আমাকে দেখতে এলেন।
তাঁকে বললাম, “ডাক্তার সাহেব, এখন একটু আরাম লাগছে।”
তিনি খাতা-কলম হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চিন্তা করে কয়েকটি পরীক্ষা দিলেন এবং বললেন, “এই পরীক্ষাগুলোর রিপোর্ট আসার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
রুম থেকে বের হওয়ার সময় আবারও বললেন, “আমি আছি, প্রয়োজন হলে ডাক দেবেন।”
কথাগুলো হয়তো খুব সাধারণ। কিন্তু একজন অসুস্থ মানুষের কাছে এই আশ্বাস কতটা মূল্যবান—তা কেবল একজন অসুস্থ মানুষই বুঝতে পারেন।
সকাল ১০টার দিকে দরজা খুলে বাইরে বের হতেই দেখি বড়লেখা প্রেসক্লাবের সিনিয়র সহ-সভাপতি জনাব ইকবাল হোসেন স্বপন ভাই আমাকে দেখতে এসেছেন। কিছুক্ষণ পর এলেন প্রেসক্লাবের অর্থ সম্পাদক বিশিষ্ট ব্যাবসায়ী জনাব সুলতান আহমদ খলিল। তাঁদের সঙ্গে দেখা, কথা ও গল্পে কিছুটা সময় কাটাতেই মন ও শরীর দুটোই যেন ভালো লাগতে শুরু করল।
এরপর একে একে আমাকে দেখতে আসেন—বড়লেখা প্রেসক্লাবের সম্মানিত সভাপতি জনাব আনোয়ারুল ইসলাম সাবেক, বড়লেখা সিটি ক্লিনিকের চেয়ারম্যান জনাব সিরাজ উদ্দিন সাহেব, সিটি ক্লিনিকের সম্মানিত পরিচালক জনাব নছিব আলী সাহেব, পৌর বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি জনাব আব্দুল মালিক সাহেব, তালিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী জননেতা তাজুল ইসলাম আয়জুল সাহেব, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট বড়লেখা শাখার সভাপতি জনাব তপন চৌধুরী সাহেব, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক শুভাশিস দে শুভ্র, তারুণ্য নাট্য গোষ্ঠীর সভাপতি প্রভাষক জনাব বদরুল ইসলাম মনু সাহেব, তারুণ্য নাট্য গোষ্ঠীর সহ-সাধারণ সম্পাদক ও নাট্য অভিনেতা সালমান কবির সাহেব, জুড়ী টিএন খানম ডিগ্রি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান গোলাম রব্বানী সাহেব, প্রভাষক অজয় চক্রবর্তী, শ্রমিক নেতা ও বড়লেখা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক বারবার নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক জনাব আব্দুল মতিন সাহেব, বড়লেখা বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ জনাব তোফায়েল আহমদ চৌধুরী, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও বিএনপি নেতা জনাব জালাল আহমদ তালাল, সিটি ক্লিনিকের পরিচালক ও পৌর কমিশনার পদপ্রার্থী জনাব খোকন আহমদ সাহেব,কাতার প্রবাসী কমিউনিটি নেতা জনাব পংকি মিয়া সাহেব,বড়লেখা উপজেলা জাসাসের সদস্য সচিব ব্যাবসী জালাল আহমদ,আমার জামাতা ও রাবেয়া ডেন্টাল কেয়ারের স্বত্বাধিকারী সাদিক আহমদ,বিকাশ কাষ্টমার কেয়ার বড়লেখা অফিসের সম্মানিত ম্যানেজার হুমায়ুন কবির তালুদার,হানিফ মুবাইল এর পরিচালক সবুজ আহমদা ও নাহিদ আহমদ, মারুফ আহমদসহ আরও অনেকে।
তাঁদের সান্ত্বনা, উপস্থিতি, ভালোবাসা, সুন্দর উপদেশ ও আন্তরিক পরামর্শ আমাকে মানসিকভাবে অনেক শক্তি দিয়েছে। তাঁদের বলা অনেক কথা আমার জীবন চলার পথে পাথেয় হয়ে থাকবে—এ বিশ্বাস আমার আছে।
সন্ধ্যা ৭টার দিকে পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে আসে। চিকিৎসক জানিয়েছেন, রিপোর্টে কিছু সমস্যা ধরা পড়েছে এবং আরও কয়েকদিন চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। আগামীকাল চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে—ক্লিনিকে থেকে চিকিৎসা চালিয়ে যাব, নাকি বাড়িতে থেকে বাকি চিকিৎসা নেওয়ার অনুমতি পাওয়া যায়।
তবে এই অসুস্থতার চার দিনে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি আমাকে আবেগাপ্লুত করেছে, তা হলো—মানুষের ভালোবাসা।
আমার ভাই-বোন, ভাগনা-ভাগনি, ভাতিজা-ভাতিজি, নাতি-নাতনি, শ্বশুর-শাশুড়ি, শ্যালক-সম্বন্ধীসহ দেশ-বিদেশে থাকা অসংখ্য আপনজন, বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষী—যাঁরা ফেসবুক, মেসেঞ্জার, ফোন ও বিভিন্ন মাধ্যমে আমার খোঁজ নিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন, দোয়া করেছেন—আপনাদের এই ভালোবাসা আমি কোনোদিন ভুলব না।
অনেকেই হয়তো ব্যস্ততা কিংবা পরিস্থিতির কারণে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেননি। কিন্তু আমার অসুস্থতার খবর শুনে অন্তর থেকে দোয়া করেছেন। আপনাদের প্রতিও আমার ও আমার পরিবারের পক্ষ থেকে রইল গভীর কৃতজ্ঞতা।
অসুস্থ শরীর নিয়ে অনেকের ফোন ধরতে পারিনি, কারও মেসেজের উত্তর দিতে পারিনি। এ কারণে কেউ মনে কষ্ট পেয়ে থাকলে আমাকে ক্ষমা করবেন।
আজ একটু আরাম অনুভব করছি বলেই মনের কথাগুলো আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিলাম। পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠলে ইনশাআল্লাহ এই চার দিনের প্রতিটি মুহূর্ত, মানুষের ভালোবাসা এবং আমার অনুভূতিগুলো নিয়ে আরও বিস্তারিত লিখব।
জীবনে অর্থ-সম্পদ, পরিচিতি কিংবা সাফল্যের চেয়েও মানুষের ভালোবাসা যে কত বড় শক্তি, এই কয়েকটি দিন আমাকে তা নতুন করে বুঝিয়েছে।
বিশেষ করে আমার/আমাদের নিজ হাতে গড়ে ওঠা বড়লেখা সিটি ক্লিনিকের সম্মানিত চিকিৎসক জনাব আবু বক্কর সিদ্দিক সাহেবসহ ক্লিনিকের সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীর আন্তরিকতা, নির্ভেজাল সেবা ও মানবিক আচরণে আমি সত্যিই মুগ্ধ।
আজ একজন রোগী হিসেবে আপনাদের কাছে আমার অন্তরের একটি আবেদন—আপনারা যেভাবে আমাকে আপনজনের মতো আন্তরিকতা দিয়ে সেবা দিয়েছেন, এভাবেই যেন প্রতিটি রোগী আপনাদের কাছে এসে নিরাপদ, আন্তরিক ও মানবিক সেবা পাওয়ার অনুভূতি নিয়ে ফিরে যেতে পারে।আপনারা দিয়ে যাচ্ছে এতে কোন সন্দেহ নেই।
চিকিৎসা শুধু ওষুধে হয় না; একজন রোগীর মনেও সাহস জাগাতে হয়। আপনাদের ব্যবহার, আন্তরিকতা ও ভালোবাসা সেই সাহসটুকুই আমাকে দিয়েছে।
পরিশেষে আমার একটাই চাওয়া—আমার জন্য সবাই দোয়া করবেন। আল্লাহ যেন আমাকে দ্রুত সম্পূর্ণ সুস্থতা দান করেন। আমিও অন্তর থেকে আপনাদের সবার জন্য দোয়া করি।
সবার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসা ও দোয়া।
—হানিফ পারভেজ