
আজ ১৭ মার্চ। বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। ১৯২০ সালের এই দিনে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের মহান নেতাশেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পেছনে তাঁর অবদান ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
শৈশব থেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ও সাহসী চরিত্রের জন্য পরিচিত ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। ছাত্রজীবনেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং ধীরে ধীরে বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা হয়ে ওঠেন। ব্রিটিশ শাসনের শেষ সময় থেকে শুরু করে পাকিস্তান আমলে পূর্ব বাংলার মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রশ্নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হলেও পূর্ব বাংলার মানুষ নানা ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হতে থাকে। এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রতিবাদ ও আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন শেখ মুজিবুর রহমান। বিশেষ করে Bengali Language Movement, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, Six Point Movement এবং 1969 Mass Uprising in East Pakistan—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অধ্যায়ে তিনি নেতৃত্ব দেন এবং বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে তোলেন।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বাধীন দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে। এর প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে তিনি এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন, যা ইতিহাসে 7 March Speech of Sheikh Mujibur Rahman নামে পরিচিত। সেই ভাষণে তিনি বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর বিখ্যাত ঘোষণা—“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”—সারা বাংলার মানুষকে মুক্তির লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করে।
এর কিছুদিন পরই শুরু হয় Bangladesh Liberation War। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমান দেশ পুনর্গঠন ও উন্নয়নের কাজে নেতৃত্ব দেন এবং জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।
দিবসটি উপলক্ষে অতীতে রাষ্ট্রীয়ভাবে নানা কর্মসূচি পালন করা হতো। জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে দিনটি উদযাপন করা হতো এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং দোয়া মাহফিলের আয়োজন করত। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা দিবসটি উপলক্ষে পৃথক বাণী প্রদান করতেন।
তবে ২০২৪ সালের ছাত্র–জনতার গণআন্দোলনের পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পরিবর্তন আসে। আওয়ামী লীগ সরকারের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে পূর্বের মতো রাষ্ট্রীয় ও দলীয়ভাবে দিবসটি উদযাপনের ধারা অনেকাংশে কমে গেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত।
ইতিহাসবিদদের মতে, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা বাঙালি জাতির ইতিহাসে গভীরভাবে প্রোথিত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও জাতির আত্মপরিচয়ের সঙ্গে তাঁর নাম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে।