
জীবনের ঝুঁকি, গ্রেপ্তার কিংবা কারাবাসের আশঙ্কা থাকলেও আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, নিজের পরিণতি সম্পর্কে তিনি সম্পূর্ণ সচেতন, তবু দেশের মানুষের আহ্বানে তিনি ফিরে যেতে চান।
বার্তা সংস্থা এএফপিকে ই-মেইলে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনা বলেন, “আমাকে হত্যা করা হতে পারে। আমাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। আমাকে কারাগারে পাঠানো হতে পারে। আমি আমার ভাগ্য সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন। তারপরও আমি দেশে ফিরতে চাই, কারণ আমার দেশের মানুষ আমাকে ডাকছে।”
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের মুখে টানা ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে শেখ হাসিনার। সে সময় বিক্ষুব্ধ জনতা তাঁর সরকারি বাসভবনে প্রবেশ করলে তিনি হেলিকপ্টারে করে ভারতে চলে যান।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টায় আন্দোলন দমনে পরিচালিত অভিযানে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হন।
গত নভেম্বরে ঢাকার একটি আদালত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে তিনি ওই রায়কে “আইনের মোড়কে রাজনৈতিক প্রতিশোধ” বলে মন্তব্য করেন।
ভারতের একটি গোপন স্থানে অবস্থানরত শেখ হাসিনা বলেন, দেশে ফেরার বিষয়ে তাঁর ওপর কোনো চাপ নেই।
তিনি বলেন, “আমি ভারতে যথাযথ সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে অবস্থান করছি। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আমার সঙ্গে প্রত্যর্পণ নিয়ে কোনো আলোচনা করেনি। দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত আমি নিজেই নিয়েছি।”
শেখ হাসিনার পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অবনতি হলেও, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়ে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে। ভারত জানিয়েছে, বিষয়টি এখনও “পর্যালোচনাধীন”। তবে শেখ হাসিনার দাবি, প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গের সঙ্গে তাঁর দেশে ফেরার সিদ্ধান্তের কোনো সম্পর্ক নেই।
ক্ষমা চাননি
দেশে ফিরলে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলায় যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যা, বিরোধী দল দমন, বিচারব্যবস্থাকে প্রভাবিত করা এবং একতরফা নির্বাচন আয়োজনসহ নানা অভিযোগ তুলে আসছে।
তবে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে শেখ হাসিনা বলেন, অনেক অভিযোগই “রাজনৈতিকভাবে সাজানো প্রচারণা”।
তাঁর ভাষায়, “যখনই কোনো অভিযোগ উঠেছে, তদন্ত করা হয়েছে এবং অপরাধে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে।”
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেছেন, শেখ হাসিনা সরকারের সময় সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। তবে চলমান অনেক বিচার আন্তর্জাতিক মানের ন্যায়বিচারের শর্ত পূরণ করছে না।
ছাত্র আন্দোলন দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগও অস্বীকার করেছেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, “আমার সরকার সর্বোচ্চ ধৈর্য দেখিয়েছে এবং ছাত্র আন্দোলনের শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা করেছে।”
তাঁর দাবি, আন্দোলনটি “শুধু একটি সাধারণ ছাত্র আন্দোলন ছিল না; বরং এটি ছিল গোপন নির্দেশনা, সংগঠিত সহিংসতা, প্রচারণা এবং সরকার উৎখাতের লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত একটি পরিকল্পিত অভিযান।”
ভারতে সাম্প্রতিক ছাত্র-যুব আন্দোলন নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান শেখ হাসিনা।
বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম কার্যত নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় দেশে ফিরে আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হবেন কি না—এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি তিনি। শুধু বলেন, “ক্ষমতা আমার গন্তব্য নয়। মানুষের সেবাই আমার লক্ষ্য।”
শেখ হাসিনা নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করলেও আন্দোলনের সময় নেওয়া সিদ্ধান্তের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ক্ষমা চাননি।
তিনি বলেন, “রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত একজন ব্যক্তি একা নেন না। পুরো সংকটের প্রেক্ষাপট বাদ দিয়ে একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তকে আলাদা করে বিচার করলে সঠিক মূল্যায়ন সম্ভব নয়।”