
মোঃ জাহান মিয়া, বিশ্বনাথ (সিলেট) প্রতিনিধি::
সিলেটের বিশ্বনাথের শ্রীধরপুর গ্রামের রাজমিনা বেগম (২২) নামের এক যুবতীর মৃত্যু নিয়ে থানার এসআই জহিরুল ইসলামের কটুক্তি ও তাহার পিতার স্বাক্ষর জাল করে অপমৃত্যু মামলা দায়েরের প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে এলাকাবাসী। বুধবার (৬ মে) বিকেলে পৌর শহরের বাসিয়া সেতুর উপর রাজমিনা হত্যার বিচারের দাবি ও পুলিশের খামখেয়ালির প্রতিবাদে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন শ্রীধরপুর ও কাউপুুর গ্রামবাসী। এসময় মানববন্ধনে থানার এসআই জহিরুলের বিরুদ্ধে নানান স্লোগানও দেন উপস্থিত আন্দোলনকারীরা।
মানববন্ধনে রাজমিনার চাচা আব্দুল আলী বলেন, এই মেয়েটা (রাজমিনা) হত্যার রহস্য হল রুহুল আমিন। সে (রুহুল) ওই মেয়েটা (রাজমিনা) অনেক বেশি ছাতাইছে (ডিস্টার্ব) দিছে। আর এ বিষয়টির ব্যাপারে মুরব্বীরাও অবগত আছেন। রাজমিনার লাশ পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। এরপর আমার ভাইকে জোরপূর্বক থানায় এনে সাদা কাগজে তার স্বাক্ষর নিয়ে মেয়েটির মৃত্যুর ব্যাপারে ওসি সাহেব বলেন এটি আত্নহত্যা। তিনি কিভাবে জানলেন এটি আত্নহত্যা? এরপরও ওসি সাহেব লোক মারফতে আমাদেরকে আশ্বাস দেন এব্যাপারে থানায় মামলা নিবেন ও অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করবেন। কিন্তু পরবর্তিতে সেই লোক মারফতই আবার জানান তিনি মামলা নিবেন না, আমরা যেনো কোর্টে মামলা করি। কোর্টে যেতে হলে ওসি কেনো থানায় আছেন। তাহলে কি শুধু টাকা খাওয়ার জন্য তারা আছেন বিশ্বনাথে।
এছাড়া মানববন্ধনে রাজমিনার পিতা কৃষক রশিদ আলী বলেন, তার মেয়ের লাশ উদ্ধারের পর তিনি থানায় মামলা করতে গেলে থানার এসআই জহিরুল ইসলাম তাকে বলেছেন ‘মেয়ে তো মরে গেছে, শেষ। আর কি? এটা নিয়ে এতো টানাটানি করছেন কেন।’ তিনি আরও বলেন, কাউপুর গ্রামের ওয়ারিছ আলীর ছেলে রুহুল আমিন (২৬)’সহ তার পরিবারের আরও ৩/৪ জন মিলে তার মেয়ে রাজমিনাকে হত্যা করে গাছে ঝুঁলিয়ে রেখেছে। কিন্তু লাশ উদ্ধারের দিন ‘লাশ ময়না তদন্তে’র কথা বলে পুলিশ একটি সাদা কাগজে তার স্বাক্ষর নেয়। আর পরে আমার স্বাক্ষর জাল-জালিয়াতি করে অন্য কাগজে লাগিয়ে তার মেয়ে আত্মহত্যা করেছে মর্মে একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। আর তিনি মেয়ে হত্যার ঘটনায় থানায় মামলা করতে গেলে দারগা-ওসি মামলা নেয়নি। তারা টাকা খেয়ে আমার মামলা চাপাই (লুকিয়ে) করেছে। তিনি মেয়ে হত্যাকারীকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানান।
মানববন্ধনে সভাপতির বক্তব্যে শ্রীধরপুর গ্রামের বাসিন্দা ও উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সুরমান খান বলেন, রুহুল কিংবা তার পরিবারের সদস্যরা যদি ‘রাজমিনা’ হত্যার সাথে জড়িত নাই থাকবে, তা হলে লাশ উদ্ধারের সাথে সাথে তারা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেল কেন? রাজমিনার পরিবারকে ন্যায় বিচার এনে দিতে আমরা এলাকাবাসী বার বার থানা পুলিশের সাথে যোগাযোগ করলেও পুলিশ আমাদের কথা আমলে নিচ্ছে না। কেনো নিচ্ছে না, তাও আমাদের কাছে স্পষ্ট। পুলিশ এঘটনায় মামলা নেওয়ার পরিবর্তে মেয়ের বাবাকে এসআই জহিুরুল ইসলাম বলেছে ‘মেয়ে তো মরে গেছে, শেষ। আর কি? এটা নিয়ে এতো টানাটানি করছেন কেন।’ এখন প্রশ্ন হচ্ছে টাকার বস্তা নিয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে একজন কন্যাহারা বাবাকে এরকমের বলা কতটুকু সঠিক।
তবে যুবতীর মৃত্যু নিয়ে কটুক্তির বিষয়টি অস্বীকার করে বিশ্বনাথ থানার এসআই জহিরুল ইসলাম বলেন, আমি এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নই। আর আমার সাথে সেই মেয়েটির বাবার দেখাও হয় নাই। তবে গ্রামের তাজেক আলী নামের এক যুবক আমাকে জিজ্ঞেস করায় আমি বলেছিলাম অপমৃত্যু মামলা হয়েছে।
এব্যাপারে বিশ্বনাথ থানার অফিসার ইন-চার্জ (ওসি) গাজী মাহবুবুর রহমান বলেন, ময়না তদন্তের কথা বলে বাদির স্বাক্ষর নিয়ে অপমৃত্যুর মামলা নেয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা। আর যেখানে আমি নিজে এ ঘটনা নিয়ে তদন্ত করছি, সেখানে এসআই বলার কিছু থাকে না।
শ্রীধরপুর গ্রামের বাসিন্দা ও উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সুরমান খানের সভাপতিত্বে এবং গ্রামের যুবক ও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য তাজেক আলীর পরিচালনায় অনুষ্ঠিত মানববন্ধন কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখেন, রামপাশা ইউনিয়ন পরিষদের স্থানীয় মেম্বার আফিজ আলী, স্থানীয় সংরক্ষিত ওয়ার্ডের মহিলা মেম্বার আঙ্গুরা বেগম, লামাকাজী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক মেম্বার আবুল কালাম, উপজেলা মহিলা দলের আহবায়ক বিলকিছ আক্তার, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য হেলাল আহমদ, বিশ্বনাথ সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহবায়ক শাহ টিপু।
উল্লেখ্য, গত ২৫ এপ্রিল শনিবার উপজেলার কাউপুর গ্রামের ফরিদ আলীর বাড়ির পেছনে পুকুরপাড়ের জঙ্গলে বাউন্ডারি দেয়ালের পাশে একটি ছোট করচ গাছে রাজমিনার ঝুলন্ত অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এর পূর্বে ২১ এপ্রিল দুপুর ২টা থেকে রাজমিনা নিখোঁজ হয়। পরিবার খোঁজাখুজি করে তাকে না পেয়ে ২৪ এপ্রিল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরী দায়ের করে। লাশ উদ্ধারের পর এঘটনায় একটি থানায় অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। রাজমিনা বেগম (২২) সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার রামপাশা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউপুর গ্রামের কৃষক রশিদ আলীর কন্যা।