ঈদের আনন্দ শেষে হাসিমুখেই কর্মস্থলের উদ্দেশে রওয়ানা হয়েছিলেন তারা। বাসের ভেতর হয়তো প্রিয়জনের সঙ্গে কাটানো সুন্দর মুহূর্তগুলোর গল্পই চলছিল। কিন্তু কে জানত, এই যাত্রাই তাদের জীবনের শেষ যাত্রা হতে চলেছে! রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে মুহূর্তের এক দুর্ঘটনায় চোখের সামনেই পদ্মার অথৈ বুকে তলিয়ে গেল ‘সৌহার্দ্য পরিবহণ’-এর যাত্রীবাহী একটি বাস। চা খাওয়ার জন্য বাস থেকে নেমে নিজে বাঁচলেও চোখের সামনে স্ত্রী ও ৭ মাসের কোলের শিশুকে তলিয়ে যেতে দেখে পাগলপ্রায় যাত্রী নুরুজ্জামান। এমন আরও বহু স্বজনের বুকফাটা আহাজারিতে এখন ভারী পদ্মার তীর।
বুধবার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে দৌলতদিয়ার ৩নং ঘাটে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। ফেরিতে উঠতে গিয়ে পন্টুন থেকে বাসটি নদীতে পড়ে যায়। এ সময় বাসটিতে ৪০-৪৫ জন যাত্রী ছিলেন। রাত ১টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ১৬ লাশ উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে ১০ নারী, ৪ পুরুষ ও দুটি শিশু। তখনো বাকিরা নিখোঁজ ছিলেন। তবে প্রত্যক্ষদর্শী অনেকে বলছেন, কয়েকজন যাত্রী বাস নদীতে পড়ার আগেই নানা কারণে নেমে গিয়েছিলেন। এছাড়া কয়েকজন যাত্রী সাঁতরে পাড়ে উঠতে পেরেছেন। রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক লাশ উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
দুর্ঘটনার পরপরই ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, সেনাবাহিনী ও স্থানীয়রা উদ্ধার কাজ শুরু করে। পরে যোগ দেয় বিআইডব্লিউটিএ’র উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা। এ সময় বৃষ্টি ও ঝড়ো বাতাসের কারণে উদ্ধারকাজে চরম বেগ পেতে হয়। প্রায় ৭ ঘণ্টার চেষ্টায় রাত সাড়ে ১২টার দিকে দুর্ঘটনাকবলিত বাসটি উদ্ধার করা হয়েছে।
সৌহার্দ পরিবহণের দৌলতদিয়া ঘাট প্রতিনিধি যুগান্তরকে জানান, ৫০ থেকে ৫২ জন যাত্রী নিয়ে বাসটি (ঢাকা মেট্রো-ব-০২৪) কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ঢাকায় যাচ্ছিল। বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে বাসটি দৌলতদিয়ার ৩নং ফেরিঘাটে পৌঁছলে ১০-১২ জন যাত্রী নেমে যান। এরপর অ্যাপ্রোচ সড়ক দিয়ে ফেরিতে উঠতে গিয়ে বাসের চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। এ সময় বাসটি পন্টুন থেকে পদ্মা নদীতে পড়ে যায় এবং ধীরে ধীরে তা গভীর জলে তলিয়ে যায়। নদীতে পড়ে যাওয়ার কিছু সময় পর পাঁচ থেকে সাতজন যাত্রী পাড়ে উঠতে সক্ষম হন। তবে অধিকাংশ যাত্রী বাসের ভেতর আটকা পড়েন। পরিবারের সঙ্গে ঈদ আনন্দ শেষে বাসের অধিকাংশ যাত্রী কর্মস্থলে ফিরছিলেন বলে জানা গেছে।
গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. মারুফ হোসেন জানান, দুর্ঘটনার পর তিনজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। এর মধ্যে দুজনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। অন্যজনকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। মারা যাওয়া দুজন হলেন-রেহেনা বেগম (৬০) ও মর্জিনা বেগম (৫৫)। রেহেনার বাড়ি রাজবাড়ীর ভবানীপুর এলাকায়। রেহেনার মেয়ে ডা. নুসরাত চিকিৎসাধীন। মর্জিনার বিস্তারিত পরিচয় পাওয়া যায়নি।
গোয়ালন্দ ফায়ার সার্ভিস, গোয়ালন্দ ঘাট থানা ও দৌলতদিয়া নৌ পুলিশ এবং স্থানীয়রা ট্রলার নিয়ে উদ্ধারের চেষ্টা চালান। ফেরিঘাটের কাছে থাকা উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধারকাজ শুরু করে। স্থানীয়রা জানান, বাসটি যেখানে পড়েছে সেখানে নদীর গভীরতা অনেক বেশি। জানা গেছে, বাসটি ৯০ ফুট গভীরে বলে শনাক্ত করছে হামজা।
দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিবহণের ঘাট তত্ত্বাবধায়ক মো. মনির হোসেন বলেন, বিকাল ৫টার কিছু পর সৌহার্দ পরিবহণের যাত্রীবাহী বাসটি দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ঘাটে আসে। এ সময় ঘাটে থাকা একটি ফেরি যানবাহন নিয়ে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। অল্পের জন্য সেটিতে উঠতে না পারায় অপর ফেরির জন্য বাসটি অপেক্ষা করছিল। সোয়া ৫টার দিকে ওই ঘাটে ‘হাসনাহেনা’ নামের একটি ইউটিলিটি (ছোট) ফেরি এসে সজোরে পন্টুনে আঘাত করে। ফেরির ধাক্কায় নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে বাসটি পদ্মা নদীতে পড়ে যায়।
উদ্ধার কাজ তদারকি করেন রাজবাড়ী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হাফিজুর রহমান। রাত পৌনে ৯টার দিকে তিনি বলেন, বাসটি শনাক্ত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বাসের সঙ্গে একটি হুক লাগানো হয়েছে। আরেকটি হুক লাগালেই বাসটি উপরে তোলার কাজ করবেন। রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনজুর মোর্শেদসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে যান। ফায়ার সার্ভিস জানায়, তাদের ডুবুরি টিম কাজ করছে। ঢাকা সদর দপ্তর থেকে আরও ডুবুরি টিম যাচ্ছে।
সৌহার্দ পরিবহণের কুমারখালী বাস কাউন্টার মাস্টার তন্বয় আহমেদ জানান, পদ্মা নদীতে নিমজ্জিত সৌহার্দ পরিবহণের বাসটিতে কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ছয়জন, খোকসা থেকে সাতজন, মাছপাড়া থেকে চারজন, পাংশা থেকে ১৫ জন যাত্রী উঠেন। ৪০ সিটের বাসে চালক- হেলপারসহ ৫০ জন ছিলেন। যাত্রীদের পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সব যাত্রীর নাম-ঠিকানা থাকে না। সাধারণত পরিচিত লোকজনের মাধ্যমে যাত্রীরা টিকিট বুক দিয়ে থাকেন। এ কারণে লাশ উদ্ধারের পর পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব। খোকসার সাংবাদিক লিটন মুন্সি জানান, বাসটিতে শোমসপুর গ্রামের গিয়াস উদ্দিন রিপন (৪৫), তার স্ত্রী লিটা খাতুন (৩৭), ছেলে আবুল কাসেম সাফি (১৭) ও আয়েশা বিন্তে গিয়াস (১৩) ছিলেন। শ্বশুরবাড়িতে ঈদের ছুটি কাটিয়ে পরিবার নিয়ে রিপন ঢাকায় ফিরছিলেন। মোবাইল ফোনে গিয়াস উদ্দিন রিপন জানান, বাসের সঙ্গে আমার স্ত্রী লিটা ও মেয়ে আয়েশা পানিতে ডুবে যায়। পরে স্ত্রীকে স্থানীয়রা উদ্ধার করলেও মেয়েকে এখনো পাইনি। এছাড়া বাসটিতে নুরুজ্জামান (৩২), তার স্ত্রী আয়েশা আক্তার (৩০) এবং তাদের সন্তান নওয়ারা আক্তার (৪) ও আরশান (৭ মাস) ছিল। নুরুজ্জামান ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। জানতে চাইলে মোবাইল ফোনে নুরুজ্জামান বলেন, সৌহার্দ পরিবহণের বাসে ঢাকা যাচ্ছিলাম। পথে ফেরিতে ওঠার সময় গাড়ি সিরিয়ালে ছিল। তখন আমি আর বড় মেয়ে নাওয়ারা বাস থেকে নেমে পড়ি। আর স্ত্রী আয়েশা ও ছোট মেয়ে আরশান বাসেই ছিল। বাসটি নদীতে পড়ে গেলে স্ত্রী ও ছোট মেয়ের সন্ধান পাইনি।
কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা বলেন, কুমারখালী থেকে শিশুসহ ৮ যাত্রী নিয়ে বাসটি ছেড়ে গিয়েছিল। তাদের বাড়ি খোকসা ও শৈলকুপা উপজেলায়। আটজনের মধ্যে তিনজন নিখোঁজের তথ্য পাওয়া গেছে।
বিএনপি মহাসচিবের শোক : দৌলতদিয়া ঘাটে হতাহতের ঘটনায় শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বুধবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি এ শোক প্রকাশ করেন। এতে আরও বলা হয়, তদন্ত কমিটি গঠন করে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের খুঁজে বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ।