হানিফ পারভেজ, বড়লেখা প্রতিনিধি
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মৌলভীবাজার-১ (বড়লেখা-জুড়ী) আসনে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট প্রার্থী মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম ১৭ দফার ইশতেহার ঘোষণা করেছেন।
সোমবার (০৯ ফেব্রুয়ারি) বড়লেখা পৌর শহরস্থ জেলা পরিষদ অডিটরিয়াম মিলনায়তনে এই ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠান হয়।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান ও সুশাসনের সমন্বয়ে একটি বৈষম্যহীন, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক বড়লেখা-জুড়ী গঠনের প্রত্যয়ে ১৭ দফা উন্নয়ন ইশতেহার ঘোষণা করা হয়েছে। ইশতেহারে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে—ক্ষমতা নয়, মানুষের অধিকারই রাজনীতির মূল লক্ষ্য; প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব পরিবর্তনই অঙ্গীকার।
ইশতেহারের প্রথম দফায় শিক্ষা ও মেধা উন্নয়নের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জুড়ীতে নারীদের জন্য পৃথক মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠা, নারী শিক্ষা ডিগ্রি কলেজ সরকারিকরণ এবং বড়লেখায় সরকারি কলেজে অনার্স-মাস্টার্স কোর্স চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এবাদুর রহমান চৌধুরী টেকনিক্যাল কলেজসহ উপযুক্ত নন-এমপিও প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তকরণ ও আধুনিকায়নের কথা বলা হয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রেও কওমী, ইবতেদায়ী ও আলিয়া মাদ্রাসার অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অনার্স কোর্স চালুর উদ্যোগের ঘোষণা রয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে বড়লেখা ও জুড়ী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শয্যা বৃদ্ধি, আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং এমবিবিএস ডিগ্রিধারী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের উপস্থিতি নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস, ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প এবং সামাজিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে কার্যকর স্বাস্থ্য কমিটি গঠনের কথাও ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত।
যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে বিআরটিসি বাস সার্ভিস চালু, কুলাউড়া-চান্দ্রগ্রাম আঞ্চলিক মহাসড়ক ফোর লেনে উন্নীতকরণ, বড়লেখা-ঢাকা সরাসরি আন্তঃনগর ট্রেন চালু এবং জুড়ী-বড়লেখা-সিলেট সড়ক উন্নয়নের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। বন্যাপ্রবণ এলাকায় আরসিসি রাস্তা নির্মাণ, বাজারের যানজট নিরসনে বাইপাস ও আধুনিক বাসস্ট্যান্ড নির্মাণের প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।
হাকালুকি হাওরকে ঘিরে ইশতেহারে পরিবেশ ও জীবিকাভিত্তিক উন্নয়নের বিশেষ রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। নদী ও হাওর ড্রেজিং করে নাব্যতা বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা নিরসন, পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রকৃত জেলেদের অধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। মাছ সংরক্ষণে মিনি আইস প্ল্যান্ট ও কোল্ড বক্স সরবরাহের কথাও বলা হয়েছে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে ‘আমার বড়লেখা-জুড়ী’ স্মার্ট অ্যাপ চালু, হাই-স্পিড ইন্টারনেট, আধুনিক হার্ডওয়্যার ও বায়োমেট্রিক সেবার মাধ্যমে সরকারি ডিজিটাল সেবাকে আধুনিক করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তরুণদের কর্মসংস্থানে আইটি ট্রেনিং সেন্টার ও ফ্রিল্যান্সিং হাব স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
ইশতেহারে চা-শ্রমিক, খাসিয়া জনগোষ্ঠী ও প্রান্তিক মানুষের অধিকারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ন্যায্য মজুরি, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন, বিদ্যুৎ সংযোগ, নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন সুবিধা এবং ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। খাসিয়া পুঞ্জিগুলোর ভূমি সমস্যা সমাধানে কার্যকর আইনি উদ্যোগ গ্রহণের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
কৃষক কল্যাণে বিনা সুদে কৃষি ঋণ, উন্নত বীজ ও ভর্তুকি মূল্যে আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য দ্রুত ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠনের অঙ্গীকার রয়েছে। পর্যটন শিল্প বিকাশে মাধবকুণ্ড জলপ্রপাতে ক্যাবল কার, ই-কার স্থাপন, হাকালুকি হাওরে ইকো-রিসোর্ট এবং চা-বাগানভিত্তিক পর্যটন উন্নয়নের পরিকল্পনাও ইশতেহারে স্থান পেয়েছে।
নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ও বয়স্কদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা জোরদার, প্রবাসীদের হয়রানি বন্ধে বিশেষ সেল, ভোটাধিকার নিশ্চিতকরণ এবং বিদেশে মৃত্যুবরণ করলে সরকারি খরচে মরদেহ দেশে আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
সবশেষে সুশাসন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ, মাসিক গণশুনানি, সিসি ক্যামেরার আওতায় বাজার এলাকা আনা এবং মাদক-চাঁদাবাজি-সন্ত্রাস দমনের কঠোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
ইশতেহারের উপসংহারে বলা হয়, “জনতার প্রয়োজনই আমাদের এই ইশতেহার। ক্ষমতা নয়, মানুষের অধিকারই আমাদের লক্ষ্য। জনগণের পাশে থেকে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা একটি দুর্নীতিমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত, বৈষম্যহীন ও ইনসাফভিত্তিক বড়লেখা-জুড়ী গড়তে বদ্ধপরিকর।”