আমরা স্মরণ করতে পারি, গত আওয়ামী লীগ সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করিয়েছিল ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার লক্ষ্যে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এ ব্যবস্থা বাতিলে এতটাই মরিয়া হয়ে পড়েছিলেন যে, সংসদীয় কমিটির পরামর্শও উপেক্ষা করছিলেন, সংসদীয় কমিটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে মত দিয়েছিল। তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেলও চেয়েছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা থাকুক। এ ব্যবস্থার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সিনিয়র আইনজীবীদের নিয়ে অ্যামিকাস কিউরি গঠন করেছিলেন আদালত। তারাও এ ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে ছিলেন। পরিতাপের বিষয়, শেখ হাসিনার মনোবাসনা পূরণ করতে আপিল বিভাগের তখনকার চার বিচারক উচ্চ আদালতের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করতেও দ্বিধা করেননি। পরবর্তীকালে এই চার বিচারপতির তিনজনকে প্রধান বিচারপতি হিসাবে নিয়োগ দিয়ে তাদের পুরস্কৃত করা হয়েছিল।
সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়া নিঃসন্দেহে একটি ভালো খবর। আমরা স্মরণ করতে পারি, খালেদা জিয়ার প্রথম টার্মে বিরোধী দলের দাবির মুখে সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নিয়েছিল। এরপর আমরা এ সরকারের সুফল পেয়েছিলাম। ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচন অপেক্ষাকৃত সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। কিন্তু ২০০৯ সালে গঠিত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা প্রলম্বিত করতে আদালতের মাধ্যমে এ ব্যবস্থা বাতিল করে দিয়েছিল। এর কুফল আমরা দেখেছি। দলীয় সরকারের অধীনে পরপর তিনটি নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হতে পারেনি। আওয়ামী লীগের দলীয় সরকার এ তিন নির্বাচনের প্রতিটিই তাদের ডিজাইন অনুযায়ী সম্পন্ন করেছে। এ কারণে নির্বাচনে জনগণের মতামত প্রতিফলিত হতে পারেনি। সরকার বলপূর্বক ক্ষমতা টিকিয়ে রেখেছে। সাধারণ ভোটারশ্রেণিও ভোট দিতে না পেরে নির্বাচনব্যবস্থার ব্যাপারে কঠোর মনোভাব ব্যক্ত করেছিল। একপর্যায়ে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বিদ্রোহে রূপ নেয় এবং ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে সরকারের পতন ঘটে।
আগামী চতুর্দশ জাতীয় নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে, এ বাধ্যবাধকতা রাজনীতিকদের সচেতন করে তুলবে নিশ্চয়ই। ত্রয়োদশ নির্বাচনে যারা বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করবেন, তারা পরবর্তী ৫ বছর সুশাসনের ব্যাপারে সতর্ক হবেন আশা করা যায়। তাদের মনে এ ভয় কাজ করবে যে, ভালোভাবে দেশ চালাতে না পারলে ভোটারশ্রেণি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠেয় পরবর্তী নির্বাচনে উপযুক্ত জবাব দেবে। এ সতর্কতা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে। আমরা আপিল বিভাগের রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করছি।